১৮ থেকে ২৪ মাস বয়স ১২ থেকে ১৮ মাস থেকে দৃশ্যত খুব আলাদা মনে হয় না, ১২ থেকে ১৮ মাস বয়সে শিশু হাঁটা, ইশারা করা, কয়েকটি শব্দ বলা এবং সহজ অনুকরণের মতো প্রাথমিক দক্ষতা অর্জন করতে শুরু করে। ১৮ থেকে ২৪ মাসে এসে এই দক্ষতাগুলো আরও শক্তিশালী, সমন্বিত এবং উদ্দেশ্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। হাঁটা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়, দৌড়ানো ও ওঠানামা শুরু হয়, ভাষা দিয়ে ভাব প্রকাশ বাড়ে, অভিনয়ধর্মী খেলা স্পষ্ট হয়, এবং স্বাধীন ভাবে চলার ইচ্ছা আরও জোরালো হয়ে ওঠে। SPICE (Social, Physical, Intellectual, Communication and creativity and Emotional), দৃষ্টিভঙ্গি সাহায্য করে, এই পর্যায়ে শিশুকে একটি পূর্ণাঙ্গ সত্তা হিসেবে দেখতে। কারণ এটি সাহায্য করে সামাজিক, শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, যোগাযোগ ও সৃজনশীল, এবং আবেগিক বিকাশ কিভাবে একসঙ্গে এগোয়।
S মানে Social: শিশুরা এখনো মানুষকে ঘিরেই শেখে
১৮ থেকে ২৪ মাস বয়সে শিশুরা বড়দের দেখে, দৈনন্দিন কাজ নকল করে, শোনা শব্দ বারবার বলে, এবং অন্যরা যা করছে তাতে অংশ নিতে চায়। তারা ঝাড়ু দেওয়া, নাড়াচাড়া করা, মোছার ভান করা, বা ফোনে কথা বলার অভিনয় করতে পারে। একই সঙ্গে তাদের পছন্দ-অপছন্দ, নিজের জিনিস নিয়ে টান, এবং অন্যরা কী করছে তা নিয়ে আগ্রহও বাড়তে পারে। এটি সামাজিক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। শিশু ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করে কিভাবে সবার সাথে কাজের মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করতে হয়।
বাবা-মা ও যত্নদাতারা সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেন তখন, যখন তারা মনোযোগ দেন ও সম্পৃক্ত থাকেন। যৌথ মনোযোগ এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যদি লক্ষ্য করেন শিশু কী দেখছে, সেটির নাম বলেন, এবং সেই মুহূর্তে অংশ নেন, তাহলে শিশু একই সঙ্গে সামাজিক সংযোগ ও দরকারি তথ্য পায়। টডলারদের (১-৩ বছর বয়সী শিশু) খেলা নিয়ে গবেষণায়ও দেখায়, যত্নদাতার ভাষা যদি শিশুর মনোযোগের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে শিশু আরও সহজে বস্তু, কাজ, এবং শব্দের সম্পর্ক বুঝতে পারে। যেমন, আপনি কলম দিয়ে লিখছেন, আর আপনার শিশু এসে কলমটি নিতে চায়। তখন আপনি তাকে একটি কাগজ দিয়ে বলতে পারেন, “এটা কলম। কলম দিয়ে দাগ টানা যায়। মা লিখছে, তুমি আঁকো।” এভাবে শিশু একসঙ্গে শব্দ শেখে, বস্তু ব্যবহার শেখে, অনুকরণ করে, এবং হাতের সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণের চর্চা করে।
P মানে Physical: নড়াচড়া এখন আরও আত্মবিশ্বাসী ও উদ্দেশ্যপূর্ণ
শারীরিক বিকাশ শেখাকে বদলে দেয়, কারণ এটি বদলে দেয় শিশু কোথায় যেতে পারে, কী ধরতে পারে, কী বহন করতে পারে, এবং কী চেষ্টা করতে পারে। ১৮ থেকে ২৪ মাস বয়সে অনেক টডলার প্রাথমিক হাঁটা থেকে আরও আত্মবিশ্বাসীভাবে দৌড়ানো, ওঠা, বসা, ঠেলা, টানা, এবং জিনিস বহন করার দিকে এগোয়। নড়াচড়া যত স্থির ও শক্ত হয়, অনুসন্ধানও তত বিস্তৃত হয়। শিশু এখন আরও সক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কোথায় যাবে এবং কী পরীক্ষা করবে।
Gross motor skills
গ্রস মোটর দক্ষতা হলো শরীরের বড় পেশিগুলো ব্যবহার করে বড় ধরনের নড়াচড়া করা। এই বয়সে এর মধ্যে থাকে আরও ভালোভাবে হাঁটা, দৌড়ানোর শুরু, নিচু আসবাবে ওঠা-নামা, বল ছোড়া, নাচা, খেলনা ঠেলা, এবং সাহায্য নিয়ে সিঁড়িতে ওঠানামার শুরু। এই দক্ষতাগুলো শুধু শরীরকে শক্তিশালী করে না, বরং স্বাধীনতা ও কৌতূহলও বাড়ায়।শিশু ঘরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে দৌড়ে যেতে পারে, তখন শেখার পরিসর ও বড় হতে থাকে।
Fine motor skills
ফাইন মোটর দক্ষতা হলো হাত ও আঙুলের ছোট পেশিগুলো ব্যবহার করে সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ তৈরি করা। ১৮ থেকে ২৪ মাসে এর মধ্যে থাকতে পারে ব্লক সাজানো, পৃষ্ঠা ওল্টানো, দাগ টানা, চামচ বা কাপ আরও নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে ব্যবহার করা এবং ছোট ছোট জিনিস নেড়েচেড়ে দেখা। ফাইন মোটর বিকাশ শিশুদের নিজের হাতে খাওয়া, আঁকার শুরু, বস্তু নিয়ন্ত্রণ করা, এবং দৈনন্দিন কাজে আরও স্বাধীন হওয়ার ভিত্তি গড়ে তোলে। একটি শিশু যখন কোনো বাক্সে জিনিস ভরে, আবার খালি করে, আবার ভরে, তখন সেটি শুধু ব্যস্ত থাকা নয়। সেটি হচ্ছে সমন্বয়, নিয়ন্ত্রণ, এবং প্রাথমিক সমস্যা সমাধানের অনুশীলন।
I মানে Intellectual: শেখা হয় পুনরাবৃত্তি, চেষ্টা, আর ধারা বোঝার মাধ্যমে
এই বয়সে শিশুরা এখনো মূলত কাজ করে শিখে, শুনে নয়। তারা একই কাজ বারবার করে, কারণ পুনরাবৃত্তি তাদের ধারা, ক্রম, এবং ফলাফল বুঝতে সাহায্য করে। আলমারি খোলা-বন্ধ করা, ব্লকের টাওয়ার ভেঙে দেওয়া, এক ঘর থেকে অন্য ঘরে জিনিস নিয়ে যাওয়া, বা একই খেলনা বারবার ফেলা, এসব আচরণ বড়দের কাছে একঘেয়ে মনে হতে পারে। কিন্তু শিশুদের জন্য এগুলোই কারণ ও ফল, স্মৃতি, এবং কাজের পদ্ধতি বোঝার উপায়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনও দেখা যায়। ১২ থেকে ১৮ মাসে শিশু হয়তো শিখছিল যে একটি কাজ করলে একটি ফল হয়। ১৮ থেকে ২৪ মাসে এসে সে সেই কাজটিই আরও ইচ্ছাকৃতভাবে বারবার করতে থাকে, যেন নিয়মটি আবার যাচাই করছে। তাই শেখা এখানে আরও উদ্দেশ্যপূর্ণ বলে মনে হয়, কারণ অনেক ক্ষেত্রেই তা সত্যিই তেমন।
C মানে Communication and creativity: ভাষা এখন ভাবকে জোড়া লাগাতে শুরু করে
এই বয়সে ভাষা অনেক সময় দ্রুত বাড়তে শুরু করে, যদিও শিশু ভেদে গতি ভিন্ন হয়। অনেক শিশু একক শব্দ থেকে দুই শব্দের ছোট বাক্যে যেতে শুরু করে, পরিচিত নির্দেশনা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারে, এবং ইচ্ছা, অস্বীকৃতি, আগ্রহ ও অনুভূতি আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশের চেষ্টা করে। একই সময়ে সৃজনশীলতাও আরও দৃশ্যমান হয় অভিনয়ধর্মী খেলা, শব্দ নিয়ে খেলা, গান শুনে নড়া, এবং এক বস্তু দিয়ে আরেক কিছুর ভান করার মাধ্যমে। একটি চামচ মাইক্রোফোন হয়ে যেতে পারে। একটি বাক্স গাড়ি হয়ে যেতে পারে। এগুলো ইঙ্গিত দেয় যে কল্পনা এখন বাস্তব বস্তুর সীমা ছাড়িয়ে যেতে শুরু করছে।
এখানেও বড়দের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা প্রায়ই শব্দ সবচেয়ে ভালো শেখে তখন, যখন শব্দগুলো তাদের করা, দেখা, বা ছোঁয়া কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকে। এ কারণেই খেলতে খেলতে জিনিসের নাম বলা, একসঙ্গে বই দেখা, গান গাওয়া, এবং দৈনন্দিন কাজ নিয়ে কথা বলা এটাকে শক্তিশালী। এখানে লক্ষ্য শিশুকে বক্তৃতা দেওয়া নয়। বরং ভাষাকে জীবন্ত অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করা।
E মানে Emotional: স্বাধীনতা বাড়লে অনুভূতিও বড় হয়
১২ থেকে ১৮ মাস এবং ১৮ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে সবচেয়ে স্পষ্ট পার্থক্যগুলোর একটি হলো আবেগের তীব্রতা। আগের ধাপে শিশুরা সাধারণত মৌলিক আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলছিল। পরে এসে তারা অনেক বেশি নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করতে চায়, নিজে কিছু করতে জোর দেয়, বাধা পেলে প্রতিবাদ করে, এবং নিজের সামর্থ্য এখনো কল্পনার সমান না হওয়ায় হতাশ হয়। এটি বিকাশের একটি স্বাভাবিক অংশ। শিশু তার নিজের ইচ্ছা ও অবস্থান সম্পর্কে আরও সচেতন হচ্ছে, কিন্তু আত্মনিয়ন্ত্রণ এখনো পরিণত হয়নি।
এ কারণেই নিরাপদ সম্পর্ক খুবি গুরুত্বপূর্ণ। শিশু নিরাপদ বোধ করলে ভালোভাবে অনুসন্ধান করতে পারে, আর বড়রা শান্ত ও নির্ভরযোগ্য থাকলে হতাশাও ভালোভাবে সামলাতে শেখে। এই বয়সে আবেগিক বিকাশ শেখা থেকে আলাদা নয়। একটি টডলার প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ধৈর্য, বিশ্বাস, আত্মবিশ্বাস, এবং হতাশা সহ্য করার ক্ষমতা গড়ে তোলে।
বাবা-মা ও যত্নদাতারা কীভাবে সাহায্য করতে পারেন
বাবা-মা ও যত্নদাতাদের জটিল শেখানোর পরিকল্পনা দরকার নেই। তারা সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেন তখন, যখন প্রতিদিনের জীবনকে নিরাপদ সুযোগ ও অর্থপূর্ণ যোগাযোগে ভরিয়ে তোলেন। শিশু কী করছে, তা নিয়ে কথা বলুন। বস্তু, কাজ, আর অনুভূতির নাম বলুন। একই ছোট বই বহুবার পড়ুন। শিশুকে ছোট বাস্তব কাজ করতে দিন, যেমন কাপড় ঝুড়িতে ফেলা, চামচ নিয়ে যাওয়া, ব্লক গুছানো, বা পাত্রে জিনিস রাখা। নিরাপদভাবে দৌড়ানো, ওঠা, সাজানো, দাগ টানা, এবং চারপাশ ঘুরে দেখার সুযোগ দিন। সবচেয়ে বড় কথা, সময় দিন। পুনরাবৃত্তি অনেক সময় দক্ষতা শেখায়, নতুন কিছু না হওয়ার লক্ষণ নয়।
একই সঙ্গে শিশুদের খুব কঠোরভাবে তুলনা না করাও জরুরি। দ্বিতীয় বছরে বিকাশ প্রায়ই অসম হয়। একটি শিশু আগে শারীরিকভাবে এগোতে পারে, পরে ভাষায়, আবার পরে আত্মবিশ্বাস বা অভিনয়ধর্মী খেলায়। তবে কোনো দক্ষতা হারিয়ে গেলে, বা একাধিক ক্ষেত্রে অগ্রগতি খুব কম হলে, হেলথ ভিজিটর, জিপি, বা শিশু বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা উচিত। নীরবে দুশ্চিন্তা করার চেয়ে দ্রুত আলোচনা করাই ভালো।






