৯ থেকে ১২ মাস: যখন শিশুর কৌতূহল কাজে পরিণত হয়

নয় থেকে বারো মাস বয়সে অনেক শিশুকেই মনে হয় যেন প্রতি সপ্তাহে বদলে যাচ্ছে। এ সময়টিতে কৌতূহল ধীরে ধীরে কাজে রূপ নিতে শুরু করে। যে শিশু আগে এক জায়গায় বসে পৃথিবী দেখত, সে এখন হয়তো হামাগুড়ি দিয়ে ঘরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যাচ্ছে, কোনো আসবাব ধরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, লুকানো খেলনা খুঁজছে, হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছে, কিংবা এমন সব শব্দ করছে যেগুলো ধীরে ধীরে প্রথম কথার মতো শোনাতে শুরু করে। এটি খুবই ব্যস্ত এবং রোমাঞ্চকর একটি সময়, কারণ এই পর্যায়ে নড়াচড়া, যোগাযোগ, স্মৃতি এবং আবেগিক সচেতনতা একসঙ্গে দ্রুত বাড়তে থাকে।

এই সময়ে সাধারণত কী কী পরিবর্তন দেখা যায়

নয় মাস বয়সে অনেক শিশু নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয়, নানা রকম মুখভঙ্গি করে, মা বা পরিচিত কেউ দূরে গেলে প্রতিক্রিয়া দেখায়, লুকোচুরি ধরনের খেলা উপভোগ করে, বারবার একই ধরনের শব্দ করতে থাকে, চোখের সামনে থেকে হারিয়ে যাওয়া জিনিস খুঁজে দেখতে চায়, এবং দুটি জিনিস একসঙ্গে ঠোকাঠুকি করতে পছন্দ করে। এক বছরের কাছাকাছি এলে অনেক শিশু হাত নেড়ে বিদায় জানায়, মা বা বাবা ধরনের পরিচিত শব্দ ব্যবহার করতে পারে, না শব্দের কিছু অর্থ বুঝতে শুরু করে, কোনো পাত্রে জিনিস ঢোকায়, লুকানো বস্তু খোঁজে, দাঁড়ানোর জন্য নিজেকে টেনে তোলে, আসবাব ধরে ধরে হাঁটে, সাহায্য নিয়ে কাপ থেকে পানি বা অন্য পানীয় খেতে পারে, এবং বুড়ো আঙুল ও তর্জনী দিয়ে ছোট খাবার তুলতে শেখে। এসব পরিবর্তন দেখায় যে শিশু শুধু শারীরিকভাবে শক্তিশালী হচ্ছে না, বরং মানুষ, বস্তু এবং দৈনন্দিন রুটিন কীভাবে কাজ করে তা-ও বুঝতে শুরু করছে।

এটি অনুশীলন, পুনরাবৃত্তি এবং আবিষ্কারের সময়

বড়দের চোখে এই বয়সটি অনেক সময় খুব পুনরাবৃত্তিমূলক মনে হয়। শিশু একই চামচ বারবার ফেলে দেয়, একই ড্রয়ার খুলতে চায়, একই বস্তু দেখিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে, বা বারবার একই দিকে হামাগুড়ি দেয়। কিন্তু এই পুনরাবৃত্তির মধ্যেই শেখা লুকিয়ে আছে। এ সময় শিশুরা কারণ ও ফলের সম্পর্ক বোঝে, শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণের অনুশীলন করে, এবং স্মৃতি ও সমস্যা সমাধানের প্রথম ভিত্তি তৈরি করে। একটি জিনিস লুকিয়ে গেলে সেটি এখনো কোথাও আছে, এই ধারণাটিও ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। তাই বড়দের কাছে বিরক্তিকর মনে হলেও শিশুর কাছে এই একই কাজের পুনরাবৃত্তি একটি গভীর শিক্ষণ প্রক্রিয়া।

পরিষ্কার কথা বলার আগেই ভাষা গড়ে উঠতে শুরু করে

অনেক বাবা-মা প্রথম শব্দ শোনার অপেক্ষায় থাকেন, কিন্তু ভাষা শেখা পরিষ্কারভাবে কথা বলার অনেক আগেই শুরু হয়ে যায়। এই সময় শিশুরা কণ্ঠের ওঠানামা, পরিচিত শব্দ, বারবার শোনা বাক্য, এবং মানুষের মুখভঙ্গির প্রতি খুব মনোযোগী হয়ে ওঠে। সে যতটা বলতে পারে, তার চেয়ে অনেক বেশি বুঝতে শুরু করে। অনেক শিশু এক বছরের কাছাকাছি এসে হাত নেড়ে বিদায় জানায়, মা বা বাবা ধরনের পরিচিত শব্দ বলে, বা না শুনলে থামে। কেউ কেউ মনোযোগ পাওয়ার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে একই শব্দ বারবার করে। এর মানে হলো, শিশুর সঙ্গে কথা বলা, সে যেটির দিকে তাকায় তার নাম বলা, তার শব্দের উত্তর দেওয়া, এবং বারবার সহজ ভাষায় কথা বলা, এগুলো মোটেই ছোট কাজ নয়। এগুলোই ভাষা গঠনের ভিত্তি।

বাবা-মা ও যত্নদাতারা সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেন প্রতিদিনের সাধারণ মুহূর্তে

এই বয়সে শেখার জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক পড়ানো দরকার হয় না। বরং শেখা আসে খুব সাধারণ মুহূর্তগুলো থেকে। ছবি-ভিত্তিক বই দেখা, শিশু যে জিনিসের দিকে আঙুল তোলে সেটির নাম বলা, গান গাওয়া, তার করা শব্দ অনুকরণ করা, এবং দৈনন্দিন কাজকে কথোপকথনের অংশ বানানো খুবই উপকারী। গোসলের সময়, খাওয়ানোর সময়, জামা পরানোর সময়, কিংবা হাঁটতে নিয়ে গেলে চারপাশের জিনিসের নাম বলা, এসবই ভাষা, সম্পর্ক, এবং মনোযোগ গঠনের অংশ। অনেক সময় বাবা-মা ভাবেন শেখাতে হলে বিশেষ কিছু করতে হবে, কিন্তু আসলে মনোযোগী, সাড়া-দেওয়া, এবং একই জিনিস ধৈর্য নিয়ে বারবার করা সবচেয়ে বড় সহায়তা।

নড়াচড়ার জন্য দরকার নিরাপদ স্বাধীনতা

এই বয়সেই অনেক শিশু হঠাৎ খুব বেশি নড়াচড়া করতে শুরু করে। কেউ হামাগুড়ি দেয়, কেউ টেনে দাঁড়ায়, কেউ আসবাব ধরে হাঁটতে শুরু করে। ফলে ঘরটি এখন শিশুর চোখে একেবারেই অন্যরকম হয়ে ওঠে। মেঝের কাছে থাকা ছোট বস্তু, ধারালো কোণা, অস্থির চেয়ার-টেবিল, খোলা তার, পরিষ্কারক দ্রব্য, ওষুধ, কিংবা ভাঙার মতো জিনিস সবই এখন বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময় বাবা-মা ও যত্নদাতার কাজ হলো শিশুকে খুব চাপ দিয়ে হাঁটানো নয়, বরং এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা যেখানে সে হামাগুড়ি দিতে পারে, টানতে পারে, পড়ে যেতে পারে, আবার চেষ্টা করতে পারে, এবং ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে পারে।

সামাজিক ও আবেগিক বিকাশ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে

এই সময়টিতে শিশুরা মানুষের প্রতি তাদের অনুভূতি আরও স্পষ্টভাবে দেখাতে শুরু করে। সে পরিচিত কারো কাছে বেশি থাকতে চাইতে পারে, মা বা বাবা ঘর থেকে বের হলে অস্থির হতে পারে, বা অপরিচিত কাউকে দেখে লজ্জা, ভয় বা আঁকড়ে থাকার আচরণ দেখাতে পারে। পরিবারে এটি কখনো কখনো কঠিন মনে হতে পারে, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি একটি স্বাভাবিক বিকাশগত ধাপ। এর অর্থ হলো শিশু এখন সম্পর্ক আলাদা করতে পারছে, নিরাপত্তার উৎস চিনতে পারছে, এবং পরিচিত ও অপরিচিতের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে শুরু করেছে। তাই এ সময় তাকে জোর করে সবার কোলে দেওয়া নয়, বরং ধীরে ও আশ্বাস দিয়ে নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় করানো বেশি সহায়ক।

খাওয়ানো এখন শুধু বড় হওয়ার বিষয় নয়, শেখারও অংশ

দশ থেকে বারো মাস বয়সে অনেক শিশুই দিনে তিন বেলা খাবারের দিকে এগোয়, যদিও দুধ এখনো গুরুত্বপূর্ণ থাকে। এ সময় শিশুরা নরম, মাখা, দলা-দলা, কাটা বা হাতে ধরে খাওয়ার মতো খাবারের নানা গঠন ও স্বাদ চিনতে শেখে। নিজের হাতে খাবার তোলা, মুখে নেওয়ার চেষ্টা করা, কাপ থেকে অল্প অল্প করে পান করা, এবং পরিবারের অন্যদের খাওয়া দেখে শেখা, এগুলো সবই বিকাশের অংশ। খাওয়ার সময় নোংরা হবে, খাবার পড়ে যাবে, মুখে কম গিয়ে হাতে বেশি যাবে, এগুলো একেবারেই স্বাভাবিক। খাওয়ানোকে যদি শুধু পুষ্টির বিষয় হিসেবে না দেখে শেখা, নিয়ন্ত্রণ, স্পর্শ বোঝা এবং অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখা যায়, তাহলে বিষয়টি অনেক সহজ হয়।

খাওয়ানোর সময় বাবা-মা ও যত্নদাতারা কীভাবে সাহায্য করতে পারেন

এই বয়সে শিশুকে খাবার স্পর্শ করতে দেওয়া, হাতে নিয়ে দেখতে দেওয়া, ফিঙ্গার ফুডের সুযোগ দেওয়া, এবং পরিবারের সঙ্গে বসে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উপকারী। শিশুরা অনেক কিছু দেখে দেখে শেখে। তাই পরিবারের অন্যরা কীভাবে খাচ্ছে, কাপ ধরে কীভাবে পান করছে, বা চামচ ব্যবহার করছে, সেগুলোও শিশু পর্যবেক্ষণ করে। নতুন খাবার সে প্রথমেই পছন্দ নাও করতে পারে। এতে হতাশ না হয়ে একই খাবার অন্যদিন আবার দেওয়া যায়। চাপ দিয়ে খাওয়ানোর চেয়ে শান্তভাবে সুযোগ দেওয়া বেশি কার্যকর। অগোছালো হওয়া, ধীরে খাওয়া, খাবার ফেলে দেওয়া, বা প্রথমে অস্বীকার করা, সবই শেখার স্বাভাবিক অংশ।

খেলা এখন শেখার সবচেয়ে বড় পথ

পরিবারের জন্য সবচেয়ে আশ্বস্ত করার মতো একটি কথা হলো, এই বয়সেও শিশুর শেখার সবচেয়ে বড় পথ হলো খেলা। লুকোচুরি, হাততালি দেওয়া, পাত্রে জিনিস ঢোকানো ও বের করা, বই দেখানো, শব্দ অনুকরণ, বা সহজ অনুকরণমূলক খেলা, এসবের মাধ্যমে শিশু একসঙ্গে অনেক কিছু শেখে। সে অপেক্ষা করতে শেখে, পালা বুঝতে শেখে, স্মৃতি ব্যবহার করে, মনোযোগ ধরে রাখতে শেখে, আনন্দ ভাগ করে নিতে শেখে। শিশু তার শেখাকে আলাদা আলাদা বিষয়ে ভাগ করে না। তার জন্য ভাষা, আবেগ, চিন্তা, নড়াচড়া, এবং সম্পর্ক সবই একসঙ্গে জড়ানো।

কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত

প্রতিটি শিশু নিজের মতো করে বড় হয়, তাই বিকাশগত লক্ষণগুলোকে কঠোর সময়সূচি হিসেবে দেখা উচিত নয়। তবু যদি কোনো বিষয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ থাকে, তাহলে দেরি না করে পরামর্শ নেওয়া ভালো। যেমন, যদি এক বছরের কাছাকাছি এসেও শিশু হামাগুড়ি না দেয়, লুকানো জিনিস খুঁজে না, সমর্থন ছাড়া দাঁড়াতে না পারে, আঙুল দিয়ে কিছু দেখায় না, সহজ শব্দও না বলে, বা আগে পারত এমন কোনো দক্ষতা হারিয়ে ফেলে, তাহলে স্বাস্থ্যকর্মী, জিপি বা শিশু বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা উচিত। উদ্বেগকে চেপে না রেখে দ্রুত আলোচনা করা অনেক সময় খুব উপকারী হয়।

মূল কথা

নয় থেকে বারো মাস বয়সে শিশু শুধু বেশি সক্রিয় হয় না। সে ভাষা, নিয়ন্ত্রণ, স্মৃতি, নড়াচড়া, এবং সামাজিক বোঝাপড়ার প্রথম ভিত্তিগুলো তৈরি করতে থাকে। এই সময় বাবা-মা ও যত্নদাতারা সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেন তখনই, যখন তারা আবেগিকভাবে উপস্থিত থাকেন, শিশুর সঙ্গে কথা বলেন, বই দেখান, নিরাপদভাবে অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি করেন, খাওয়াকে শেখার অংশ হতে দেন, এবং বোঝেন যে পুনরাবৃত্তি আসলে বিকাশেরই কাজ। ঘরের একেবারে সাধারণ জিনিস, একটি খেলা, একটি চামচ, একটি শব্দ, একটি আলিঙ্গন, শিশুর বিকাশে অসাধারণ ভূমিকা রাখতে পারে।

About সময় চাকা

আমরা বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত কিছু বাংলাদেশী। সময়ের চাকায় আমরা চলেছি সুখের সন্ধানে, সেই প্রস্তর যুগ থেকে শুরু করে আজও চলছে সন্ধান আর অনুসন্ধান । তাই চলুন সময়ের চাকায় পিষ্ট না হয়ে, সময় চাকা ধরে চলতে থাকি, সময়কে সুন্দর করে রাখার আশায়…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *