লেখক: ড. মো. হক | বাংলা সায়েন্স মিশন
মূল উৎস: BBC News | Animals react to secret sounds from plants
আমরা অনেকেই জানি, গাছ জীবন্ত। তারা বড় হয়, সূর্যালোক গ্রহণ করে, পানি টানে। কিন্তু এখন বিজ্ঞান বলছে—গাছ কেবল নিরব দাঁড়িয়ে থাকে না, তারা শব্দও করে! এবং আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই গোপন শব্দ শুনে প্রাণীরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে: ডিম কোথায় পাড়বে, কোন গাছ সুস্থ, কোনটা দূর্বল!
🌿 গাছের ‘চিৎকার’: একটি অদৃশ্য ভাষা
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, গাছ যখন চাপের মধ্যে থাকে—যেমন পানি না পেলে বা কাটাকাটি হলে—তারা এমন একধরনের আল্ট্রাসনিক (অতিসূক্ষ্ম) শব্দ তৈরি করে, যা মানুষের কানে শোনা যায় না। তবে অনেক পতঙ্গ, বাদুড়, এমনকি কিছু স্তন্যপায়ী প্রাণী সেই শব্দ শুনতে পারে।
এই শব্দ আসলে কীভাবে তৈরি হয়? এটি হাইড্রোলিক ক্যাভিটেশন নামের একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটে। পানি টানতে গিয়ে গাছের ভেতরের নালীগুলিতে বুদবুদের মতো ফাঁপা সৃষ্টি হয় এবং সেই বুদবুদ ভেঙে শব্দ তৈরি করে।
🧪 একটি সহজ মডেল: পানি না পেলে গাছ কী করে?
- গাছ তার মূল দিয়ে মাটি থেকে পানি টানে।
- পানি কমে গেলে অভ্যন্তরীণ চাপ পড়ে যায়।
- এই চাপের কারণে স্টেমে ছোট ছোট বুদবুদ তৈরি হয়।
- বুদবুদ ভাঙলে আল্ট্রাসনিক শব্দ হয়—একটা ‘সিগন্যাল’ হিসেবে কাজ করে।
🦋 স্ত্রী মথ ও শব্দভিত্তিক সিদ্ধান্ত
গবেষকরা দেখেছেন, স্ত্রী মথ (moth) গাছের সেই শব্দ শুনে বুঝে ফেলে গাছটি দুর্বল কি না। দুর্বল গাছে ডিম পাড়লে লার্ভারা খাবার পাবে না—এটা সে বুঝে ফেলে শব্দ শুনেই!
একটি পরীক্ষায় তারা দেখেছেন, গাছ যদি চাপের মধ্যে থাকে এবং সেই শব্দ তৈরি করে, তাহলে মথরা সেই গাছে ডিম পাড়ে না। এর মানে, একটা অদৃশ্য কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থা কাজ করছে গাছ ও প্রাণীর মধ্যে।
🌱 গাছের মাঝে নিজস্ব বার্তা আদান-প্রদান?
এই গবেষণা আরও বড় প্রশ্ন তোলে: গাছেরা কি নিজেদের মধ্যেও এমন শব্দের মাধ্যমে বার্তা পাঠাতে পারে? উদাহরণস্বরূপ, যদি এক গাছ পানি সংকটে পড়ে, তাহলে কি পাশের গাছে শব্দ পাঠিয়ে বলে—“সতর্ক হও, আমি পানি পাচ্ছি না”? যদি এই প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে তা আমাদের জৈবিক ইকোসিস্টেম বোঝার এক নতুন স্তর খুলে দেয়।
🔬 এই আবিষ্কারের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব কী?
- এটি প্রথম প্রমাণ যে প্রাণীরা গাছের তৈরি শব্দের প্রতিক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
- এটি দেখায় যে প্রকৃতি আরও জটিল এবং আন্তঃসংযুক্ত, যেমনটা আমরা ধারণা করি।
- গাছ ও প্রাণীর মধ্যে সহ-উন্নয়নের (co-evolution) সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।
🧭 ভবিষ্যৎ গবেষণার দিগন্ত
এই গবেষণাটি eLife জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে এবং এটি কেবল শুরু। সামনে আরও প্রশ্ন আসছে—
- সব গাছ কি শব্দ করে?
- কী ধরনের প্রাণী এই শব্দ শুনে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে?
- মানুষ কি প্রযুক্তির সাহায্যে এই গোপন ভাষা বুঝে ফেলতে পারবে?
উপসংহার
প্রকৃতি যেন এক গোপন নাট্যশালা—যেখানে প্রতিটি গাছ আর প্রাণী নিজেদের ভাষায় কথা বলে। এই গবেষণা আমাদের দেখিয়ে দিল যে, শুনতে না পেলেও, দেখা না গেলেও, গাছের ভেতর চলছে এক শব্দের সংলাপ—আর সেই শব্দই চালিত করছে প্রাণীর সিদ্ধান্ত। এটা কেবল বিজ্ঞান নয়, এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, যা আমাদের চারপাশের প্রকৃতিকে আরও গভীরভাবে অনুভব করার সুযোগ দেয়।
— বাংলা সায়েন্স মিশনের পক্ষ থেকে ড. মো. হক






