৫ থেকে ৬ বছরে বিকাশ ও শেখার কিছু মূল বিষয়

এই বয়সে অনেক শিশু সহযোগিতামূলক (Cooperative) ও রূপক খেলা (dramatic play) -এর মাধ্যমে ভাগাভাগি করা, নিয়ম মানা, মতবিরোধ মেটানো এবং অন্যের অনুভূতি বোঝার অনুশীলন করে। যেমন, ডাক্তার-রোগী বা দোকানে কেনাবেচার অভিনয় করা।Theory of Mind আরও পরিণত হওয়ায় তারা বুঝতে পারে যে বন্ধুর চিন্তা, ইচ্ছা ও অনুভূতি নিজের থেকে আলাদা হতে পারে। তাই বন্ধুত্ব এখন শুধু খেলার সম্পর্ক নয়, বরং সহানুভূতি, ন্যায্যতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সমস্যার সমাধান শেখার ক্ষেত্র।

1. বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও আবেগ বোঝার ক্ষমতা
পাঁচ থেকে ছয় বছর বয়সে শিশুর সামাজিক জগৎ দ্রুত বিস্তৃত হয়। পরিবার ছাড়িয়ে স্কুল ও সমবয়সী শিশুদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বন্ধুত্ব এর আগেও শুরু হতে পারে, কিন্তু এই বয়সে অনেক শিশু নির্দিষ্ট কিছু শিশুকে বন্ধু হিসেবে বেছে নিতে, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে এবং দলের অংশ হিসেবে নিজেকে দেখতে শুরু করে। কে তাকে খেলায় নেয়, কে তার কথা শোনে, কোন আচরণটি ন্যায্য, কিংবা কে “আমার বন্ধু”, এসব বিষয়ও তার কাছে আগের তুলনায় বেশি অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।

খেলাতেও এই পরিবর্তন স্পষ্ট। শিশুরা এখন শুধু পাশাপাশি খেলার বদলে সহযোগিতামূলক ও কল্পনাভিত্তিক খেলায় (cooperative and dramatic play) বেশি অংশ নিতে পারে। তারা নিজেরাই গল্প বা পরিস্থিতি তৈরি করে, যেমন দোকানদার-ক্রেতা, ডাক্তার-রোগী বা পরিবারের সদস্য, এবং কে কোন ভূমিকা নেবে তা নিয়ে আলোচনা ও সমঝোতা করে। এই ধরনের খেলার মাধ্যমে ভাগাভাগি করা, নিয়ম মানা, নিজের মত প্রকাশ এবং মতবিরোধ মেটানোর মতো সামাজিক দক্ষতার অনুশীলন হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ খেলনা, যেগুলো দিয়ে শিশু নিজের মতো করে নানা ধরনের খেলা তৈরি করতে পারে, সেগুলো চিন্তা, কল্পনা, ভাষা ও সামাজিক মিথস্ক্রিয়াকে বেশি উৎসাহিত করতে পারে। এই বয়সে শিশুর অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার ক্ষমতাও আরও পরিণত হয়। প্রিস্কুল বয়সে গড়ে ওঠা Theory of Mind এখন বাস্তব বন্ধুত্বে কাজে লাগে। শিশু ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে যে একজন বন্ধুর ইচ্ছা, জানা বিষয় বা অনুভূতি তার নিজের থেকে আলাদা হতে পারে। ফলে বন্ধুর মন খারাপ হলে সান্ত্বনা দেওয়া, কাউকে খেলায় অন্তর্ভুক্ত করা, ভুল বোঝাবুঝি বুঝতে চেষ্টা করা বা নিজের আচরণে অন্যের কেমন লাগতে পারে তা ভাবার ক্ষমতা বাড়ে।

তবে বন্ধুত্বের সঙ্গে নতুন আবেগিক চ্যালেঞ্জও আসে। খেলায় না নেওয়া, হার-জিত, “ও আর আমার বন্ধু নয়”, কিংবা নিয়ম নিয়ে ঝগড়া এই বয়সে অস্বাভাবিক নয়। শিশুরা কখনো নিয়ম বা সামাজিক সীমাও পরীক্ষা করে দেখে। এসব পরিস্থিতি বড়দের জন্য শুধু আচরণ সংশোধনের সুযোগ নয়, বরং সহানুভূতি, ন্যায্যতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সম্পর্ক মেরামত শেখানোর সুযোগ।

এ সময় বাবা-মা ও যত্নদাতার কাজ শিশুর জন্য বন্ধু ঠিক করে দেওয়া বা প্রতিটি ঝগড়ার সমাধান করে দেওয়া নয়। বরং তাকে ভাবতে সাহায্য করা। শিশু যদি বলে, “ও আজ আমার বন্ধু না”, তখন জিজ্ঞেস করা যেতে পারে, “কী হয়েছিল?”, “তোমার কেমন লেগেছিল?” বা “পরেরবার কীভাবে কথা বলতে পারো?” দুই শিশু একই খেলনা চাইলে বলা যেতে পারে, “তোমরা দুজনেই এটা চাও, তাহলে কীভাবে সমাধান করা যায়?” এভাবে তাদের কাছ থেকেই সমাধান খুঁজে বের করা। বন্ধুত্ব শিশুর জন্য শুধু খেলার সম্পর্ক নয়, বরং সহযোগিতা, সহানুভূতি, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক সমস্যা সমাধান শেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

2. শরীরের নিয়ন্ত্রণ ও দৈনন্দিন স্বাধীনতা

এই বয়সে শিশুদের বড় পেশী (Gross motor skills) এবং সূক্ষ্ম পেশী (Fine motor skills)-র সমন্বয় দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এই সময় তাদের চলাফেরা হয় আরও চটপটে, ভারসাম্যপূর্ণ ও নিয়ন্ত্রিত।

বড় পেশীর বিকাশ (Gross motor skills)

Gross motor skills হলো শরীরের বড় পেশিগুলো ব্যবহার করে দৌড়ানো, লাফানো, ভারসাম্য রাখা, বল আরও ভালোভাবে ধরতে ও ছুড়তে শেখা এবং এমন খেলায় অংশ নিতে পারে যেখানে একই সঙ্গে নড়াচড়া ও নিয়ম মানতে হয়। বলের খেলা শুধু শরীরের ব্যায়াম নয়। শিশুকে শুনতে হয়, কী হবে তা আন্দাজ করতে হয়, শরীর সমন্বয় করতে হয় এবং কখনো হঠাৎ থামতেও হয়। তাই শারীরিক খেলাও মনোযোগ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ গড়ে তুলতে সাহায্য করে। এই সময় বাইরের খেলার গুরুত্ব অনেক। অসম জায়গায় দৌড়ানো, ওঠানামা, সাইকেল চালানো, ভারসাম্য রাখা এবং প্রকৃতির মধ্যে চলাফেরা শিশুকে দূরত্ব, গতি এবং ছোটখাটো ঝুঁকি বিচার করতে শেখায়। একই সঙ্গে নিজের শরীরের ওপর আস্থাও বাড়ে।

সূক্ষ্ম পেশীগত বিকাশ (Fine motor skills):

Fine motor skills হলো হাত, আঙুল ও কবজির ছোট পেশি ব্যবহার করে সূক্ষ্ম কাজ করার ক্ষমতা, যেমনঃ লেখা, আঁকা, কাটাকাটি, নির্মাণমূলক খেলা, পোশাকের বোতাম লাগানো এবং ছোট দৈনন্দিন সরঞ্জাম ব্যবহার করার দক্ষতা। অনেক শিশু অক্ষর ও সংখ্যা লেখায় আরও দক্ষ হয়, ছবিতে বেশি বিস্তারিত যোগ করে, কাঁচি আরও নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে ব্যবহার করে, ছোট পাজল সমাধান করে এবং নির্মাণ খেলনার ছোট অংশ ব্যবহার করতে পারে।

3. চিন্তা ও ভাষা আরও সংগঠিত হয়

এই বয়সে শিশুদের চিন্তাশক্তি এবং ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক বড় পরিবর্তন আসে। এই বয়সে বুদ্ধিবৃত্তিক বোঝাপড়া (Cognitive Empathy) বা অন্যের দৃষ্টিকোণ থেকে অনুভূতি ও চিন্তা বোঝার দক্ষতা এবং নিজের আচরণ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের (Self-regulation) ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। শিশুরা তাদের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা, মনের চিন্তা এবং অনুভূতির কথা ভাষার মাধ্যমে বর্ণনা করতে সক্ষম হয়। সামাজিক আচার অনুষ্ঠান বুঝতে শুরু করে। অর্থাৎ, এই বয়সে ভাষা শুধু কথা বলার মাধ্যম নয়, চিন্তা সংগঠিত করা ও শেখার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। তারা নতুন শব্দ শেখার পাশাপাশি কথার ভেতরের সূক্ষ্ম অর্থ বা কৌতুক বুঝতে শুরু করে । সময়ের প্রাথমিক ধারণা বোঝা (যেমন: দিন ও রাতের পার্থক্য, ঘড়ি দেখে সময় বলা), সংখ্যার ধারণা লাভ করা, শ্রেণীকক্ষে বা কোনো নির্দিষ্ট কাজে টানা ১৫ মিনিট মনোযোগ বজায় রাখা।

4. খেলাই এখনো শেখার অন্যতম প্রধান মাধ্যম

এই সময় দুই ধরনের খেলাই শিশুর বিকাশের জন্য গুরুত্ব পূর্ণ, Structured games বা সুসংগঠিত খেলা এবং unstructured child-led play শিশুর কল্পনাই খেলা।

Structured play বা সুসংগঠিত খেলা হলো এমন খেলা যেখানে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য, নিয়ম বা পদ্ধতি থাকে। খেলাটি সাধারণত বড় কেউ পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন, অথবা শিশুরা আগে থেকে জানা নিয়ম অনুসরণ করে খেলতে পারে। যেমন সাপলুডু, দাবা, মাচিং গেম বা বলের খেলা, এক কথাই নির্দিষ্ট নির্দেশনা মেনে খেলা করা। পাঁচ থেকে ছয় বছর বয়সে এ ধরনের খেলা বিশেষভাবে উপকারী, কারণ শিশুকে একই সঙ্গে নিয়ম মনে রাখা, অপেক্ষা করা, মনোযোগ ধরে রাখা, তাৎক্ষণিক ইচ্ছা নিয়ন্ত্রণ করা এবং কখনো কৌশল বদলানো শিখতে হয়। ফলে সুসংগঠিত খেলা (structured play) শুধু বিনোদন নয়; এটি পরিকল্পনা ও মানসিক নিয়ন্ত্রণ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সমস্যা সমাধান এবং সামাজিক দক্ষতা অনুশীলনেরও সুযোগ দেয়।

অন্যদিকে, unstructured child-led play বা শিশুর কল্পনাই খেলা, যা মননশীল খেলা অনুপ্রাণিত করে এবং কল্পনাশক্তিকে বিকশিত করে। এখানে বড়রা কিছুটা পিছিয়ে থেকে শিশুকে নিজের খেলা তৈরি করতে দেন। TIMPANI- (Toys that Inspire Mindful Play and Nurture Imagination) গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো, বেশি প্রযুক্তি মানেই বেশি শেখা নয়। খোলা বা মুক্ত ধারার খেলনা (Open-ended toys) যেমন রঙিন কাপড়ের টুকরো বা সাধারণ পাথর, কিম্বা কাঠের ব্লক, মোট কথা যা শিশুকে নিজে গল্প তৈরি, পরিকল্পনা, সমস্যা সমাধান এবং আবার চেষ্টা করার সুযোগ দেয়। একটি ব্লক কখনো বাড়ি, কখনো সেতু, কখনো দোকান হতে পারে, অর্থাৎ শিশুর কল্পনাই খেলাকে চালায়। অনেক সময় শিশু অনেক মনোযোগের সাথে নিজের মনে কিছু একটা করতে থাকে, আমরা তাতে বিরক্ত বা উদ্বিগ্নও হয় কখনো কখনো, এটা যদি বিশেষ কোণ ক্ষতির কারন না হয় তাহলে শিশুকে তার মত করে কাজটি করতে দেওয়া উচিত।

5. একসঙ্গে (বাবা, মা বা অবিভাবক) বই পড়াও বিশেষ ভাবে গুরুত্ব পূর্ণ
এই বয়সে বই শুধু পড়ে শোনানো নয়, বরং শিশুর সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যায়। কথোপকথনমূলক গল্প বলা বা পড়া শিশুকে নিষ্ক্রিয় শ্রোতা না রেখে গল্প নিয়ে কথা বলতে উৎসাহিত করা হয়। “কে?”, “কেন?”, “এরপর কী হতে পারে?”, “চরিত্রটির কেমন লাগছে?” ধরনের প্রশ্ন করা, গল্পের অংশ মনে করতে বলা এবং নিজের ভাষায় গল্পটি আবার বলতে দেওয়া যায়। চিত্রসমৃদ্ধ, ছন্দময় বা গল্পভিত্তিক বই বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা যায়। যেমন The Very Hungry Caterpillar-এর ছবি দেখে পরের ঘটনা অনুমান করা, এর পুনরাবৃত্ত অংশ শিশুকে শেষ করতে দেওয়া, নিজের ভাষায় ঘটনাটি বলতে উৎসাহিত করা।

শিশুর দৈনন্দিন রুটিনে সুসংগঠিত শারীরিক খেলাধুলার পাশাপাশি শিশুর নিজস্ব পরিচালনায় মুক্ত কল্পনামূলক খেলার ভারসাম্য রাখা জরুরি। মুক্ত খেলার সময় প্রাপ্তবয়স্কদের কাজ হলো সরাসরি হস্তক্ষেপ না করে কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করা এবং শিশুকে নিজের কল্পনায় অ্যাডভেঞ্চার তৈরি করতে দেওয়া। টিভি, কম্পিউটার বা ভিডিও গেমের মতো স্ক্রিন টাইম বা পর্দার ব্যবহারের ওপর নির্দিষ্ট ও সময়োপযোগী সীমারেখা বজায় রাখুন। খেয়াল রাখতে হবে যেন পর্দার অতিরিক্ত ব্যবহার কোনোভাবেই শিশুর শারীরিক খেলাধুলা, পারিবারিক মেলামেশা, বাইরের পরিবেশ অন্বেষণ এবং রাতে পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম থেকে তাকে বঞ্চিত না করে। বাবা-মা ও যত্নদাতার মূল ভূমিকা একটি সাধারণ সূত্রে আসে: সবকিছু করে দেওয়া নয়, বরং শিশুকে কথা বলা, পড়া, খেলা, বন্ধুত্ব গড়া এবং ছোট সমস্যা নিজে সমাধানের সুযোগ দেওয়া, পাশে থেকে প্রয়োজনমতো সাহায্য করা।

About সময় চাকা

আমরা বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত কিছু বাংলাদেশী। সময়ের চাকায় আমরা চলেছি সুখের সন্ধানে, সেই প্রস্তর যুগ থেকে শুরু করে আজও চলছে সন্ধান আর অনুসন্ধান । তাই চলুন সময়ের চাকায় পিষ্ট না হয়ে, সময় চাকা ধরে চলতে থাকি, সময়কে সুন্দর করে রাখার আশায়…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *