১২ থেকে ১৮ মাস, এই সময়টিতে অনেক ক্ষেত্রেই শিশুকে আর কেবল শিশু মনে হয় না, বরং ধীরে ধীরে টডলার হিসেবে দেখা দিতে শুরু করে। কেউ হাঁটা শুরু করে, কেউ আঙুল তুলে কিছু দেখায়, কেউ বড়দের কাজ নকল করে, আবার কেউ কয়েকটি পরিষ্কার শব্দ বলতে শুরু করে। এই বয়সে শেখা খুব দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তারা নড়াচড়া করে, দেখে, একই কাজ বারবার করে, অনুকরণ করে, এবং চারপাশের জীবনে অংশ নিতে চায়। শেখা এখানে আনুষ্ঠানিক পড়াশোনার মাধ্যমে হয় না। হয় দৈনন্দিন জীবন যাপণ আর মনোযোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে।
এই বয়সকে বোঝার একটি কার্যকর উপায় হলো SPICE দৃষ্টিভঙ্গি।এতে বোঝা যায়, বিকাশ শুধু শারীরিক বৃদ্ধির বিষয় নয়। শিশুরা একসঙ্গে সামাজিক, শারীরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, যোগাযোগ ও সৃজনশীল, এবং আবেগিক দিক থেকে বড় হয়। এই ক্ষেত্রগুলো আলাদা আলাদা নয়। একটি শিশু যখন একটি চামচ হাতে নিয়ে ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাচ্ছে, তখন সে হয়তো একসঙ্গে শরীরের নিয়ন্ত্রণ, কৌতূহল, স্মৃতি, স্বনির্ভরতা এবং সামাজিক অনুকরণ ব্যবহার করছে।
S মানে Social (সামাজিক): মানুষকে ঘিরেই শেখা
১২ থেকে ১৮ মাস বয়সে শিশুরা অন্য মানুষকে দেখে অনেক কিছু শেখে। তারা বড়দের কাজ খুব মন দিয়ে দেখে এবং সেই কাজ নকল করার চেষ্টা করে। যেমন, চামচ দিয়ে নাড়ার ভান করা, ফোন কানে ধরা, টেবিল মুছতে চাওয়া, বা কারও হাতে কিছু তুলে দেওয়া। এগুলো কেবল মজার আচরণ নয়। এগুলোর মাধ্যমে শিশু বুঝতে শুরু করে যে মানুষ কীভাবে কাজ করে, জিনিস কীভাবে ব্যবহার করে, এবং দৈনন্দিন জীবন কীভাবে চলে।
এই সময় অনেক শিশু আঙুল তুলে কিছু দেখায়, অন্যের মনোযোগ নিজের পছন্দের জিনিসের দিকে আনতে চায়, এবং কোনো কিছু দেখে অন্যকে জানানোর চেষ্টা করে। এর অর্থ হলো বাবা-মা ও যত্নদাতারা সবচেয়ে বেশি সাহায্য করতে পারেন তখনই, যখন তারা শিশুর দিকে মনোযোগ দেন, সে যা দেখছে তা-ই দেখেন, তার ইশারা বা শব্দের জবাব দেন, এবং সহজ খেলায় অংশ নেন। শিশু যে দিকে মনোযোগ দিচ্ছে, সে বিষয়ে কথা বলা ভাষা শেখা ও বোঝার ক্ষমতা বাড়াতে বিশেষভাবে সহায়ক।
P মানে Physical (শারীরিক): নড়াচড়া নিজেই শেখা
এই বয়সে শারীরিক বিকাশ শেখার বাইরে নয়, বরং শেখারই অংশ। নড়াচড়া করার ক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুর কাছে পৃথিবী আরও বড় হতে থাকে। যখন শিশু নিজে হাঁটতে পারে, বসতে পারে, কিছু বহন করতে পারে, ওঠানামা করতে পারে, তখন সে নিজেই ঠিক করতে পারে কোথায় যাবে, কী দেখবে, কী ধরবে। এর ফলে তার শেখার সুযোগও অনেক বেড়ে যায়।
শারীরিক বিকাশের ভেতরে gross motor এবং fine motor দক্ষতাকে আলাদা করে বোঝা উপকারী।
Gross motor skills
গ্রস মোটর দক্ষতা হলো শরীরের বড় পেশিগুলো ব্যবহার করে বড় ধরনের নড়াচড়া করা। ১২ থেকে ১৮ মাসে অনেক শিশু প্রাথমিক হাঁটা থেকে আরও আত্মবিশ্বাসী চলাফেরার দিকে এগোয়। কেউ জিনিস হাতে নিয়ে হাঁটে, কেউ ওঠে দাঁড়ায়, কেউ সামান্য ওপরে উঠে বসে, কেউ খেলনা ঠেলে এগোয়।
Fine motor skills
ফাইন মোটর দক্ষতা হলো হাত, আঙুল এবং কবজির ছোট পেশিগুলোর সূক্ষ্ম ব্যবহার। এর মধ্যে ছোট বস্তু তোলা, পৃষ্ঠা ওল্টানো, আঙুল দেখানো, ব্লক সাজানো, চামচ ধরা, দাগ টানা, বা ছোট জিনিস নিয়ন্ত্রণ করা অন্তর্ভুক্ত। এই দক্ষতাগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো নিজের হাতে খাওয়া, জিনিস পরীক্ষা করা, ছবি আঁকার শুরু, এবং হাতের নিয়ন্ত্রণ তৈরিতে সহায়তা করে।
একটি শিশু যখন বারবার কোনো বাক্সে জিনিস ঢোকায় এবং বের করে, তখন সেটি শুধু খেলা নয়। সে নিখুঁততা, সমন্বয়, এবং প্রাথমিক সমস্যা সমাধানের দক্ষতা গড়ে তুলছে।
বাবা-মা ও যত্নদাতাদের জন্য বার্তাটি সহজ। নিরাপদে নড়াচড়ার সুযোগ দিন। মেঝেতে সময় দিন, হাঁটার জায়গা দিন, ঠেলার মতো মজবুত জিনিস দিন, সাজানোর মতো ব্লক দিন, পূর্ণ ও খালি করার মতো পাত্র দিন, পৃষ্ঠা ওল্টানোর মতো বই দিন, এবং চামচ হাতে নিয়ে অনুশীলনের সুযোগ দিন। শিশুকে সব সময় থামিয়ে বা তাড়াহুড়া করিয়ে নয়, বরং নিরাপদ স্বাধীনতা দিয়ে শারীরিক বিকাশকে সমৃদ্ধ করা যায়।
I মানে Intellectual (বুদ্ধিবৃত্তিক): চেষ্টা, পুনরাবৃত্তি, আর পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে শেখা
এই বয়সে বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঘটে হাতে-কলমে। শিশুরা শুধু ব্যাখ্যা শুনে শেখে না। তারা কিছু করে, দেখে কী হয়, আবার করে। এ কারণেই তারা একই কাজ বারবার করে। চামচ ফেলে, আবার তোলে, আলমারি খোলে, বন্ধ করে, জিনিস এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেয়, আবার ফিরিয়ে আনে। বড়দের কাছে এগুলো বিরক্তিকর লাগতে পারে, কিন্তু শিশুর জন্য এগুলো কারণ ও ফল, স্মৃতি, ক্রম, এবং নিয়ন্ত্রণ শেখার উপায়।
এ কারণেই প্রতিদিনের সাধারণ রুটিনও শেখার শক্তিশালী ক্ষেত্র। খাওয়ার সময়, গোছগাছের সময়, জুতা পরার সময়, গোসলের সময়, বা ছোট হাঁটার সময় শিশু ধীরে ধীরে নিয়ম, পুনরাবৃত্ত ভাষা, এবং কাজের ফলাফল বুঝতে শেখে। বড়রা যদি একটু ধীরে চলেন এবং শিশুকে অংশ নিতে দেন, তাহলে সাধারণ মুহূর্তও শেখার মুহূর্ত হয়ে ওঠে।
C মানে Communication and Creativity (যোগাযোগ ও সৃজনশীল): যৌথ অভিজ্ঞতা থেকে ভাষা ও সৃজনশীলতা
১২ থেকে ১৮ মাসে শিশু সাধারণত যতটা বলতে পারে, তার চেয়ে অনেক বেশি বুঝতে পারে। সে হয়তো খুব অল্প কয়েকটি শব্দ বলে, কিন্তু আঙুল তোলা, তাকানো, শব্দ করা, মুখভঙ্গি, এবং শরীরের ভাষা দিয়ে অনেক কিছু জানায়। সে বুঝতে শুরু করে যে যোগাযোগ শুধু কথা নয়। এর মধ্যে মনোযোগ চাওয়া, আনন্দ ভাগ করা, সাহায্য চাওয়া, আপত্তি জানানো, এবং অন্যকে কিছু দেখানোও আছে।
এটি সৃজনশীলতারও শুরুর সময়। শিশু খালি কাপ হাতে নিয়ে পান করার ভান করতে পারে, খেলনাকে অন্যকে খাওয়ানোর মতো দেখাতে পারে, বা কোনো জিনিসকে অন্য কিছুর মতো ব্যবহার করতে পারে। শব্দ, ছন্দ, নড়াচড়া, এবং অনুকরণমূলক খেলায় সে নতুনভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে শেখে।
এই সময় বাবা-মা ও যত্নদাতারা জিনিসের নাম বলতে পারেন, সহজ বাক্য বারবার বলতে পারেন, ছবি-ভিত্তিক ছোট বই পড়তে পারেন, অঙ্গভঙ্গিসহ গান গাইতে পারেন, এবং শিশুকে বাস্তব জীবনের সহজ কাজ অনুকরণ করতে দিতে পারেন। শিশু যে দিকে মনোযোগ দিচ্ছে, সে বিষয়ে কথা বললে ভাষা শিখতে সহায়তা হয়।
E মানে Emotional (আবেগিক): নিরাপত্তা থেকে আসে অনুসন্ধানের সাহস
এই বয়সে শিশুরা আগের চেয়ে স্বাধীন দেখালেও, তারা এখনো আবেগিক নিরাপত্তার ওপর ভর করেই শেখে। একটি শিশু হয়তো দূরে গিয়ে কিছু দেখে, আবার ফিরে এসে সান্ত্বনা নেয়। কিছু নিজে করতে চায়, আবার না পারলে বিরক্ত হয়। তার পছন্দ-অপছন্দ জোরালো হয়, হতাশা বাড়ে, এবং পরিচিত মানুষ ও রুটিনের প্রতি টানও শক্তিশালী হয়। এগুলো বিকাশের পথে বাধা নয়। বরং এগুলো বিকাশের অংশ।
বাবা-মা ও যত্নদাতারা সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেন তখন, যখন তারা শান্ত, এবং মনোযোগের সাথে সাড়া দেয়। কোমল সীমারেখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর দরকার চেষ্টা করার সুযোগ, তবে তার সঙ্গে নিরাপত্তা, নিয়মিততা, এবং আশ্বাসও দরকার। যে শিশু নিজেকে নিরাপদ মনে করে, সে নতুন কিছু শেখার জন্য ছোট ছোট ঝুঁকি নিতে বেশি প্রস্তুত থাকে।
বাবা–মা ও যত্নদাতারা কীভাবে বাস্তবে সাহায্য করতে পারেন
এই বয়সে সহায়তা জটিল কিছু নয়। দরকার ধারাবাহিকতা।
শিশু যা দেখছে বা করছে, তা নিয়ে কথা বলুন। পরিচিত জিনিস ও কাজের নাম বলুন। তাকে ছোট ছোট দৈনন্দিন কাজে অংশ নিতে দিন। নিরাপদে হাঁটা, কিছু বহন করা, ব্লক সাজানো, পাত্র ভরা-খালি করা, পৃষ্ঠা ওল্টানো, এবং দাগ টানার সুযোগ দিন। একই ছোট বই বহুবার পড়ুন। একই কাজ বারবার করার জন্য যথেষ্ট সময় দিন। সব ভুল সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করে দেওয়ার দরকার নেই। সব কাজ শিশুর হয়ে করে দেওয়ারও দরকার নেই। অনেক সময় শিশু একটু চেষ্টা করে, কিছুটা হোঁচট খাই, পাশে সহায়তামূলক বড় কেও থাকলেই সে নিজেই আবার চেষ্টা করে , আর এভাবেই সবচেয়ে বেশি শেখে।
১২ থেকে ১৮ মাস বয়সে শিশু পুরো সত্তা দিয়ে শেখে। সে মানুষকে ঘিরে সামাজিকভাবে শেখে, নড়াচড়ার মাধ্যমে শারীরিকভাবে শেখে, পুনরাবৃত্তি ও আবিষ্কারের মাধ্যমে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে শেখে, যৌথ মনোযোগ ও ইশারার মাধ্যমে যোগাযোগ শেখে, অনুকরণ ও অভিনয়ধর্মী খেলায় সৃজনশীলতা গড়ে তোলে, এবং নিরাপদ সম্পর্কের মধ্যে আবেগিকভাবে বড় হয়। SPICE দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে এই ক্ষেত্রগুলো আলাদা নয়। একটি আঙুল তোলা, কাঁপতে কাঁপতে হাঁটা, চামচ ফেলে দেওয়া, বড়দের কাজ নকল করা, বা একটি শব্দ বারবার বলা, সবই গভীর শেখার লক্ষণ হতে পারে।
এক বছর পর থেকে পরিবর্তন প্রতি তিন মাসে কেন চোখে পড়ে না?
জীবনের প্রথম বছরে শিশুর বিকাশ খুব দ্রুত মনে হয়, কারণ তখন পরিবর্তনগুলো খুব মৌলিক এবং চোখে পড়ার মতো হয়। যেমন, ঘাড় শক্ত হওয়া, বসা, হামাগুড়ি দেওয়া, দাঁড়ানো, বা প্রথম শব্দের মতো আওয়াজ করা। কিন্তু এই পর্যায়ের পর বিকাশ থেমে যায় না। বরং তা আগের মতো খুব নাটকীয়ভাবে বা ঠিক তিন মাসের ছোট ছোট ভাগে চোখে পড়ে না। শিশুরা তখন একেবারে নতুন দক্ষতা অর্জনের চেয়ে আগের দক্ষতাগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে আরও পরিণতভাবে এগোতে থাকে। এ সময় বিকাশও কিছুটা অসম হয়ে যায়। কোনো শিশু কিছুদিন ভাষার দিকে দ্রুত এগোয়, আবার অন্য সময় সামাজিক আত্মবিশ্বাস, সমস্যা সমাধান, বা শারীরিক সমন্বয়ের দিকে বেশি অগ্রগতি দেখাতে পারে। অর্থাৎ, বিকাশ শক্তভাবে চলতেই থাকে, কিন্তু তা হয়ে ওঠে আরও ধীর, আরও পরস্পর-সংযুক্ত, এবং একেক শিশুর ক্ষেত্রে একেক রকম।






